1. admin@spicynews24.com : admin :
  2. nfjsduwdwdyu@gmail.com : mk tr : mk tr
ডাকছে ইসলামাবাদ, এবার কি সাড়া দেবে ঢাকা! -

ডাকছে ইসলামাবাদ, এবার কি সাড়া দেবে ঢাকা!

  • আপডেটঃ বুধবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২১
  • ১০ বার পঠিত

 

দক্ষিণ এশিয়ায় গানের মধ্য দিয়ে রাজনীতি প্রকাশ পায়। এমন অগণিত সুরেলা মাস্টারপিসের মধ্যে ‘ও হামসাফার থা’ নামের সাড়া জাগানিয়া পাকিস্তানি গানটি বেশ চলছে। গানটি এমন: ও হামসাফার থা, মাগার উস সে হামনাওয়াই না থি…/আদাবাতেঁই থি, তাগাফুল থা, রাঞ্জিশে থি মাগার/ বিছারনে ওয়ালে মে সাব কুছ থা, বেওয়াফাই না থি…

এর বাংলা অনুবাদ কিছুটা এমন: সে ছিল আমার সঙ্গী (ভ্রমণের সাথী) কিন্তু আমাদের মধ্যে ছিল না মিল…/ ছিল বৈরিতা, অভিন্নতা ও বেদনার অনুভূতি, আমি আমার বিদায়ী সঙ্গীর মধ্যে এর সবকিছু পেয়েছি কিন্তু কোনো অবিশ্বস্ততা পাইনি… ২০১১ সালে ‘হামসাফার’ নামে একটি রোমান্টিক সোপ-অপেরায় ব্যবহৃত গানটির ইন্ডি-ঘরানার রিমেক দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু তরুণদের বেশিরভাগই জানে না যে, গানটির সঙ্গে প্রেমিক-হৃদয়ভঙ্গের কোনো সম্পর্ক নেই।

কোনো রোমান্টিক যুগল নয়, আদতে গানটিতে বর্ণনা করা দুই সঙ্গী হলো— পাকিস্তান ও বাংলাদেশ, পাঁচ দশক আগে যেই দেশ দুটি আলাদা হয়ে গেছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের খবর পৌঁছানোর পরপরই গজলটি লিখেছিলেন নাসির তুরাবি। ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ পাঞ্জাব ও বঙ্গে বিভক্ত হওয়ার পর, পূবের বাঙ্গালিরা হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে তাদের পশ্চিমা সহধর্মীদের সঙ্গে মিলে পাকিস্তান গঠন করে। পাকিস্তান হলো দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের একটি ভূমি।

আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান একক দেশ হলেও, এটি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—একটির রাজধানী ছিল ঢাকা ও অপরটির করাচি। দুই ভাগের মধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের উপর দিয়ে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব ছিল। এছাড়া ছিল ব্যাপক সাংস্কৃতিক, ভাষাগত, সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিন্নতা। এ দেশের টেকারই কথাই ছিল না। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিব বা ‘বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বে ও ভারতের সহায়তায় এক পর্যায়ে আলাদা হয়ে যায় বাংলাদেশ। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান অবিভক্ত অবস্থায় টিকে ছিল ২৪ বছরেরও কম সময়। ১৯৭১ সালে দুই ভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পাকিস্তানের গঠনের নেপথ্যে যেই দুই-রাষ্ট্র তত্ত্বের ভূমিকা ছিল, সেই তত্বের জন্য এই বিচ্ছেদ ছিল বিশাল এক চপেটাঘাত। কাগজে-কলমে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ব্যাপক মিল রয়েছে। দুই দেশই হলো বৃটিশ-ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরসূরি; দুই দেশই মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ। উভয়ের সঙ্গেই রয়েছে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত; যদিও ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তটি রন্ধ্রবহুল ও ইন্দো-পাকিস্তান সীমান্তটি বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়িত হওয়া সীমান্তগুলোর একটি।

তা যাই হোক, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ঢাকা ও ইসলামাবাদের (১৯৬৭ সাল থেকে পাকিস্তানের রাজধানী) সম্পর্কে টানাপোড়ন দেখা দেয়। ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠতা, সাবেক পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামি শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বিংশ শতাব্দির শেষের দিকে শেখ হাসিনা সরকারের জোরালো চাপে দুই দেশের মধ্যে ‘৭১ পরবর্তী সম্পর্কে দীর্ঘ ছায়া ফেলেছে। তবে এর আগে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শাসনামলে কিছুটা সৌহার্দ্য দেখা গিয়েছিল।

পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপির বরাবরই তুলনামূলক ভালো সম্পর্ক ছিল। যাইহোক, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় ফেরে। এরপর থেকে শক্তভাবেই তা আকড়ে রেখেছে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে ২০০৯ সালে দলটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) গঠন করে। এই ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্তরা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের সদস্য হওয়ায় ট্রাইব্যুনালটি নিম্ন বিচারিক মানদণ্ডের জন্য পাকিস্তানে সমালোচিত হয়।

এর পাশাপাশি, অভিযোগ উঠে যে, ট্রাইব্যুনালটি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ব্যবহৃত হয়েছে। এককালের ‘হামসাফার’দের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গত এক দশকে প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। ২০১৩ ও ২০১৬ সালে জামাত-ই-ইসলামির (জেইআই) সদস্যদের ফাঁসি কার্যকরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তান পার্লামেন্ট। দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক তখনই সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় নেমে আসে। ২০১৯ সালের মে মাসে দুই দেশ পারস্পরিক ভিসা প্রদানও বন্ধ করে দেয় সাময়িকভাবে।

২০০৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পাকিস্তান সফর করেছিলেন। দেশটিতে বাংলাদেশের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সর্বশেষ সফর ছিল সেটি। তবে ২০১৯ ও ২০২০ সালজুড়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নেওয়া বেশ কিছু পদক্ষেপ ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে বরফ কিছুটা গলবে – এমন জল্পনার উদ্ভব হয়েছে। ভারত সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করে কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পর ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে কাশ্মীর ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান জানাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কুরেশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এম মোমেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনা ভাইরাস মহামারি নিয়ে আবার তাদের মধ্যে কথা হয়। একই বছরের জুলাইয়ে ঢাকায় মোমেনের সঙ্গে দেখা করেন পাকিস্তানি হাই-কমিশনার আই এ সিদ্দিকী। এর কয়েকদিন পর শেখ হাসিনার সঙ্গে এক সৌজন্য ফোনালাপ হয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের। তারা করোনা মহামারি ও কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইসলামাবাদ সফরে যাওয়ার নিমন্ত্রণ দেন ইমরান খান। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার প্রতিশ্রুতিও দেন খান।

পরবর্তীতে ৩রা ডিসেম্বর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাক-হাই কমিশনার সিদ্দিকী। আবারও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার আগ্রহ প্রকাশ করে পাকিস্তান। বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক খাতে অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে তারা। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার নতুন এই যোগাযোগে সতর্ক হয়ে উঠে ভারত। দেশটি ইতিমধ্যে কাশ্মীর ইস্যুতে বিক্ষোভ, লকডাউন, চীনের সঙ্গে সীমান্তবিরোধ ও আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে অবনমন ঘিরে ঝড়ো সময় পার করছিল।

কেউ কেউ মনে করেন, ‘প্রতিবেশী প্রথম’ ও ‘লুক ইস্ট’ নীতিমালা অনুসরণের ঘোষণা দিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রতি নয়া দিল্লির কিছুটা অমনোযোগী আচরণে দুই দেশের মধ্যে যে ফাটল দেখা দিয়েছে, তার সুযোগ নিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার একটি মিল হচ্ছে, উভয় দেশের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগকারী, উন্নয়নের সহযোগী ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী হয়ে উঠছে চীন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, ভারত ছাড়াও বাংলাদেশের হাতে নির্ভরযোগ্য অপশন আছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় মিত্র হচ্ছে চীন। আবার ২০১৬ সালে কৌশলগত সহযোগিতায় উন্নীত হয়েছে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক। সবমিলিয়ে, বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সন্দেহাতীতভাবেই হিমশীতল একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনরুদ্দীপ্ত করার দিকে ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই সম্পর্ক বিষাক্ত করার মূল উপাদানগুলো নিয়ে এখনো কাজ করা হয়নি। সে উপাদানগুলো বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিন্নতায় এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ঘিরে তাদের নিজ নিজ অবস্থানে প্রোথিত।

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালিদের বিরুদ্ধে পাক-সেনাদের কার্যক্রমের জন্য আওয়ামী লীগ ও বেশিরভাগ বাংলাদেশিরা পাকিস্তানের কাছ থেকে ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করে। অন্যদিকে, পাকিস্তান গণহত্যা করার অভিযোগ অস্বীকার করে। এমনকি যুদ্ধের সময় নিহত হওয়া বাংলাদেশিদের যে সংখ্যা ঢাকা দাবি করে, তাও অস্বীকার করে। বিষয়টি অত্যন্ত বিতর্কিত হওয়ায়, কোথায় ইতিহাসের সমাপ্তি আর কোথায় জাতীয়তাবাদী বর্ণনা শুরু, তা নির্ধারণ করা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

দুই দেশের মধ্যকার অন্যান্য অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে: বাংলাদেশের বিহারীদের অবস্থান; সম্পত্তি ভাগের প্রশ্ন; যুদ্ধবন্দি এবং বেসামরিক বন্দিদের প্রত্যাবাসন ঘিরে ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তি, যদিও দুই দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তিটি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। এদিকে, পাকিস্তানের আপত্তি অগ্রাহ্য করে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার অব্যাহত রয়েছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তিন বছর স্থগিত থাকার পর ফের এসব মামলার আপিল গ্রহণ শুরু করেছে। একই বছরে, আইসিটি ১৪ জন সাবেক জেইআই ও রাজাকার বাহিনীর জঙ্গিদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।

এছাড়া, কাশ্মীর ইস্যুতেও বাংলাদেশ হস্তক্ষেপ না করার অবস্থান গ্রহণ করেছে। ঢাকায় ভারতের ৩৭০ ধারা রদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হলেও, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন জানিয়েছেন, এটি ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, বাংলাদেশ এতে জড়াবে না। ১৯৭১ সালের বিচ্ছেদ ছিল অত্যন্ত তিক্ত। পাকিস্তান এখন প্রস্তাব দিচ্ছে। কিন্তু ঢাকা চায় ইসলামাবাদ কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে ভুল শুধরাক। এরপর হয়তো একসঙ্গে নতুন যাত্রা শুরু হতে পারে। (লেখক : সিলভিয়া তিয়েরি একজন রাজনীতি বিজ্ঞানী। কিংস কলেজ লন্ডন ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সিঙ্গাপুরের যৌথ পিএইচডি প্রোগ্রামে ২০১৯ সালে যোগ দেন তিনি। বর্তমানে তিনি কিংস ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউটে কর্মরত। তার এই নিবন্ধটি ‘স্ট্রাইফব্লগ’-এ ইংরেজিতে ছাপা হয়।)

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরও খবর পড়ুন
© 2021 | All rights reserved by Spicy News
Customized BY Spicy News