1. admin@spicynews24.com : admin :
  2. nfjsduwdwdyu@gmail.com : mk tr : mk tr
অপারেশন মিটিংহাউজ: ইতিহাসের ভয়াবহতম বিমান হামলা -
শিরোনাম

অপারেশন মিটিংহাউজ: ইতিহাসের ভয়াবহতম বিমান হামলা

  • আপডেটঃ বুধবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৩ বার পঠিত

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপানে সংগঠিত হয় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের দিক দিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর বিমান হামলা- এই কথা শোনামাত্র যেকোনো ইতিহাসপ্রেমী পাঠকের মাথায় আসবে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলে পারমাণবিক বোমা হামলার কথা। কিন্তু ঐ দুটি ঘটনায় ফেলা হয়েছিল একটিমাত্র বোমা।

আবার পারমাণবিক বোমা ও সাধারণ বোমার শক্তিমত্তার পার্থক্য সম্পর্কে সকলেই জানেন। ম্যানহ্যাটান প্রজেক্ট, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ এনার্জি-এর পরিসংখ্যান মতে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে প্রায় ৬০ হাজারের মতো মানুষ বোমা ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তী কয়েক মাসে তেজস্ক্রিয়তা ও জখম নিয়ে হতাহতের মোট সংখ্যা আনুমানিক প্রায় ১.২৯ লাখ থেকে ২.২৬ লাখ, যা মূলত হামলার পরের হিসাব।

আজকের লেখায় আপনাদের যে ঘটনা সম্পর্কে জানানো হবে, সেখানে এক রাতেই নিহত হয়েছিল প্রায় এক লাখের মতো জাপানি! পুড়ে ছারখার হয়ে যায় রাজধানী টোকিওর ৪১ বর্গ কিলোমিটার এলাকা। ধ্বংস হয় ২.৬৭ লাখ ভবন, ঘরবাড়ি হারায় এক মিলিয়নের বেশি মানুষ। চলুন জেনে নেয়া যাক ইতিহাসের ভয়াবহতম এই বিমান হামলা সম্পর্কে। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে জড়িয়েছিল মূলত তাদের শক্তিশালী নৌবাহিনীর উপর ভরসা করে।

কিন্তু একের পর এক যুদ্ধে হারতে হারতে জাপানের দখলে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলো মিত্রবাহিনীর হাতে আসতে থাকে। পার্ল হারবার হামলার জবাবে চালানো ডুলিটল রেইড নিয়ে রোর বাংলায় প্রকাশিত লেখায় বলা হয়েছিল যে, জাপানি হাইকমান্ড তাদের মেইনল্যান্ডে হামলা কোনোভাবেই বরদাশত করতে পারেননি। তাই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৪ সালের জুন মাস থেকে এসব পুনঃদখলকৃত দ্বীপ এবং চীনের মুক্তাঞ্চল ব্যবহার করে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও সামরিক কারখানাগুলোতে হামলা চালানো শুরু করে।

কিন্তু বোমারু বিমানের রেঞ্জ খুব বেশি নয়। ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের অংশ হিসেবে Boeing B-29 Superfortress নামক লংরেঞ্জ বোমারু বিমান সার্ভিসে আসার পর জাপানে নিয়মিত বিমান হামলা চালাতে শুরু করে ইউএস আর্মি এয়ারফোর্স (আগে মার্কিন বিমানবাহিনী সেনাবাহিনীর অংশ ছিল)।

কিন্তু জার্মানি-ইতালিতে এ ধরনের প্রিসিশন বোম্বিং কৌশল অবলম্বন করে তেমন সাফল্য পাওয়া যায়নি। বিমানগুলোকে দিনের আলোতে খুব নিচে এসে বোমা ফেলতে হতো, যা এন্টি এয়ারক্রাফট কামানের গোলা ও শত্রুর ইন্টারসেপ্টর বিমানের গুলির মুখে বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। আর কোনো কারণে আবহাওয়া খারাপ থাকলে তো কথাই নেই, তীব্র বাতাসের কারণে বোমা লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো। ফলে টার্গেট এলাকার শুধুমাত্র সামরিক স্থাপনায় হামলা (প্রিসিশন বোম্বিং) করার বদলে পুরো এলাকা জুড়ে হামলার (কার্পেট বোম্বিং) কৌশল বেছে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

এতে বেসামরিক প্রাণহানির সম্ভবনা বেশি থাকার পরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে পারদর্শী প্রিসিশন বোমার বদলে ইন্সেন্ডিয়ারি তথা অগ্নিবোমার ব্যবহার শুরু হয়। ফলে একে firebombing raid নামেও আখ্যায়িত করা হয়। শত্রুর থেকে কম বাধা পেতে রাতের বেলা হামলা করা হয়। এতে বিমানের বোম্বারডিয়ার ক্রুগণ কম উচ্চতায় এসে বোমা ফেলার সুযোগ পান বটে, কিন্তু শত্রুর ব্ল্যাকআউট (বিমান হামলা থেকে বাঁচতে পুরো শহরের বাতি নিভিয়ে রাখা) কৌশলের কারণে বেছে বেছে শুধুমাত্র সামরিক টার্গেটে হামলা করা সম্ভব ছিল না।

শত্রুর ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির কারণে ফায়ারবোম্বিং কৌশল মিত্রদেশগুলোর ভেতরে-বাইরে সমালোচিত হলেও জাপানের আত্মসমর্পণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এটাই ছিল একমাত্র কৌশল। এরই ধারাবাহিকতায় পরিচালিত হয় অপারেশন মিটিংহাউজ, যার মূল টার্গেট ছিল টোকিওর বেসামরিক নাগরিকরা।

হামবুর্গ, ড্রেসডেন শহরসহ পুরো জার্মানিতে হামলার ক্ষেত্রে মার্কিন ও ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্স যথাক্রমে ১৪% ও ২১% হাই-এক্সপ্লোসিভ বোমা ব্যবহার করত। ১১ নভেম্বর, ১৯৪৪ সালের একটি অপারেশনে XXI Bomber Command এর মেজর জেনারেল হেনরি আর্নল্ড একই কৌশল প্রয়োগ করে ব্যর্থ হন। তিনি তার প্রাইমারি টার্গেটে (একটি জাপানি বিমান ও ইঞ্জিন নির্মাণ ফ্যাক্টরি) প্রিসিশন বোমা এবং আশেপাশের বেসামরিক এলাকায় হাই-এক্সপ্লোসিভ ইন্সেন্ডিয়ারি বোমা ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি আশানুরূপ না হওয়ায় তিনি পদচ্যুত হন। তার স্থলাভিষিক্ত মেজর জেনারেল কার্টিস লিম্যায় এবার গদি বাঁচনোর জন্য সাধারণ যুদ্ধনীতির ধারে-কাছে গেলেন না।

সামরিক-বেসামরিক সব টার্গেটের উপর গণহারে ফায়ারবোম্বিং রেইড শুরু করেন। এ ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে জাপানের প্রায় সব ধরনের শিল্প এলাকা ছিল খুবই নাজুক। দ্বীপরাষ্ট্রটিতে প্রচুর গাছপালা থাকায় হামলার পর আগুন ছড়াতে বেশি সময় লাগত না। আবার নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশ হিমশিম খেতে হতো। যুক্তরাষ্ট্র আগেই পরিসংখ্যানবিদদের দিয়ে হিসাব করিয়ে দেখেছিল যে জাপানের ছয়টি বড় বড় শহরের মাত্র ৪০% ফ্যাক্টরিতে হামলা হলে প্রতি মাসে প্রায় ৭.৬ মিলিয়ন শ্রমিকের সমতুল্য শ্রম (man-months of labor) নষ্ট হবে, ৫ লাখ আহত-নিহত হবে, ৭.৭৫ মিলিয়ন লোক গৃহহীন এবং ৩.৫ মিলিয়ন লোককে অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে। কিন্তু জেনারেল কার্টিসের এ ধরনের সিধান্তের কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য, জাপান যুদ্ধের শুরুর দিকে চীনে এভাবে ফায়ারবোম্বিং রেইড পরিচালনা করেছিল। বি-২৯ বিমানকে সুপার ফোট্রেস বা দুর্গ বলা হত। এর চারদিকে প্রতিরক্ষার জন্য মোট ১০টি মেশিনগান বসানো ছিল।

এটি তার ফ্লাইট উচ্চতা অনুযায়ী ২.৩ টন থেকে ১০ টন বোমা নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কি.মি. পাড়ি দিতে সক্ষম ছিল। XXI Bomber Command এর ঘাঁটি মারিয়ানা আইল্যান্ডে ১৯৪৫ সালের মার্চ থেকেই এম-৬৯ ইন্সেন্ডিয়ারি বোমার বিরাট মজুদ গড়ে তোলা হয়। এম-৬৯ বোমাতে Napalm নামক একপ্রকার রাসায়নিক ব্যবহার করা হতো যা অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ। আগুন লাগলে সহজে নেভানো যেত না, শরীরে কোনোভাবে আগুন লেগে গেলে হাড় পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলত। (ভিয়েতনাম যুদ্ধেও একই ধরনের বোমা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র।) ২৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫ সালে জেনারেল কার্টিস তার কৌশল সঠিক কিনা পরীক্ষা করতে একটি টেস্ট ট্রায়াল দেন। এজন্য ১৭২টি বি-২৯ বোমারু বিমান দিয়ে টোকিওতে দিনের আলোতে হামলা চালান, যেখানে প্রায় ২৮ হাজার ভবন ধ্বংস/ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এই সাফল্য আরো বড় আকারে হামলা চালানোর ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।

অপারেশন মিটিংহাউজের জন্য মোট ৩২৫টি বোমারু বিমান প্রস্তুত করা হয়! অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, দিনের চেয়ে রাতে হামলা করলে কম উচ্চতায় এসে বোমা ফেলা সম্ভব। আবার কম উচ্চতায় বিমান উড়িয়ে আনলে বেশি পেলোড নেয়া সম্ভব। দেখা গেল, প্রতিটি বি-২৯ বিমান লো অ্যালটিটিউডে যে পরিমাণ বোমা বহন করতে পারবে, তা হাই অ্যালটিটিউড পেলোডের প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু এটি করতে গেলে কম ফুয়েল নিতে হতো। জেনারেল কার্টিস এবার তাই পাইলটদের ফরমেশনে (ঝাঁক বেঁধে) না উড়ে আলাদা আলাদা ওড়ার অনুমতি দিলেন। কেননা, ফরমেশনে থাকতে বারবার গতির সমন্বয় করতে বেশি ফুয়েল খরচ হয়। মার্কিনিদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল যে জাপানিদের মাত্র দুটি নাইট ফাইটার ইউনিট (রাতের যুদ্ধে পারদর্শী) তখন সক্রিয় ছিল, যাদের মোট বিমান সংখ্যা মাত্র ২৬টি। তাদের তরফ থেকে তেমন বাধা আসবে না জেনে বি-২৯ বিমানের মেশিনগান ও কম প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশগুলো সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন যেন, বেশি বোমা/ফুয়েল নেয়া যায়।

তিনটি বোম্বার উইংয়ের দুটি ৬.৪ টন এবং একটি উইং ৪.৫ টন বোমা নিয়ে এই মিশনে অংশগ্রহণ করে। এই অপারেশনের বিভিন্ন আর্কাইভ ফুটেজ দেখুন এখানে। এরই মধ্যে জাপানিরা রেডিও মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে ধারণা করে যে মার্কিনিরা বড় ধরনের ‘নাইট রেইড’ এর পরিকল্পনা করছে। এজন্য তারা বাড়তি যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে আশেপাশের ঘাঁটি থেকে জরুরি ভিত্তিতে ৭৮০টি হেভি এন্টি এয়ারক্রাফট গান টোকিওতে মোতায়েন করে। প্রয়োজনে আরো ৬৩৮টি লাইট এন্টি এয়ারক্রাফট মেশিনগান জরুরি ভিত্তিতে মোতায়েন করা যাবে। এগুলোর সাহায্যকারী হিসেবে পর্যাপ্ত সংখ্যক সার্চলাইট ও বসানো হয় যা বিমান বিধ্বংসী কামানগুলোকে রাতের অন্ধকার আকাশে টার্গেট খুঁজে পেতে সহায়তা করত। কিন্তু তাদের জানা ছিল না যে এই হামলায় মার্কিনীরা হাই অ্যালটিটিউড বোম্বিং ট্যাকটিক্স অনুসরণ করবে না। ফলে এন্টি এয়ারক্রাফট গান ও শক্তিশালী সার্চলাইট তেমন কাজেই আসবে না। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে টোকিও ফায়ার সার্ভিসে পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতি ছিল না। ২৮৭টি স্টেশন মিলিয়ে মাত্র ৮ হাজার দমকলকর্মী ছিল।

আক্রমণ হলো শুরু ৮ মার্চ, ১৯৪৫ সালের সকালে জেনারেল কার্টিস হঠাৎ করে অপারেশন মিটিংহাইজের গ্রিন সিগন্যাল দেন। ক্রুদের জানানো হয় তারা আগামীকাল রাতে টোকিওর কিছু কারখানাতে ফায়ারবোম্বিং রেইড শুরু করবে। এজন্য ৩৬ ঘণ্টা ধরে বিমানগুলোকে প্রস্তুত করা হয়। হামলার স্থানকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। এদের মধ্যে জোন ১ এর কথা আলাদাভাবে বলতে হবে। এটি আসলে ৪×৩ মাইলব্যাপী আয়তাকার অঞ্চল।

এখানে প্রায় ১.১ মিলিয়ন লোকের বসবাস ছিল যা তৎকালীন টোকিওর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। জোন ১-এ সামান্য কয়েকটি ফ্যাক্টরি ছিল যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট নয়। এই অঞ্চলে যারা বাস করত তাদের প্রায় সকলেই আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল। রাজধানীতে অবস্থান হলেও এদের বাসস্থানগুলো বাঁশ-কাঠের তৈরি ঐতিহ্যবাহী জাপানি বাড়িঘর যা ফায়ারবোম্বিংয়ের আগুন দ্রুত ছড়ানোর জন্য আদর্শ এলাকা। হাজারো মানুষের মৃত্যু পরোয়ানায় সাইন করা জেনারেল কার্টিস অপারেশন শুরুর পর নিজে আর নেতৃত্ব দিতে পারেননি। কেননা পারমাণবিক বোমা তৈরির খবর দেয়ার পর গোপনীয়তা রক্ষার জন্য তাকে XXI Bomber Command থেকে সাময়িক প্রত্যাহার করা হয়।

৯ আগস্ট, ১৯৪৫ সালের বিকাল সাড়ে পাঁচটায় গুয়াম, তিনিয়ান ও সাইপান ঘাঁটি থেকে বি-২৯ বিমানগুলো আকাশে উড়তে শুরু করে। ৩২৫টি বিমান উড়তে মোট সোয়া তিন ঘণ্টা সময় লাগে। বিমানগুলো ৫-৭ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল যেন হামলার সময় লাইট মেশিনগানের রেঞ্জের উপরে থাকে আবার হেভি এন্টি এয়ারক্রাফট গানের ইফেক্টিভ রেঞ্জের নিচে থাকে। বোমারু বিমানগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া চারটি বি-২৯ বিমান অবশ্য ২৫ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ে যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকায় ১৬ কি.মি. দূর থেকেও টার্গেট দেখা যাচ্ছিল। তবে বাতাস ছিল খুবই বেশি যা আগুন ছড়ানোর জন্য আদর্শ অবস্থা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই ধরনের আরও খবর পড়ুন
© 2021 | All rights reserved by Spicy News
Customized BY Spicy News