Sun. Dec 5th, 2021

 

একজন প্রবাসীর লেখা,,,,! বাপ হইয়া আমি নিজেরে কেমনে ক্ষমা করি? ছুটি কাটায়ে দেশ থেকে আসার তিন মাস পরে জানলাম, আমি নাকি বাপ হবো! ফোনে খবরটা দিতে গিয়ে বউডা আমার লজ্জায় মইরা যাইতেছিলো। ছেলে হইবো নাকি মেয়ে- এই নিয়ে রোজ খুনসুটি করতাম দুইজনে।

ইচ্ছা করতো, চাকরি বাকরি সব ফালায়ে এক্ষণই দেশের বিমানে উইঠা বসি, চইলা যাই বউয়ের কাছে। কিন্ত সেটা করলে তো নতুন মেহমানরে না খেয়ে থাকা লাগবে। কোম্পানীতে বলে রাখলাম ছুটির কথা। তাদের আবার নিয়ম, একবার ছুটি কাটানোর এক বছর পার হওয়ার আগে আবার ছুটি নেয়া যায় না।

হিসাব করে দেখলাম, বাচ্চার বয়স দুইমাস হইলে পরে আমি দেশে যাইতে পারব। জুন মাসে আমার মেয়েটা দুনিয়ার আলো দেখলো, ভিডিও কলে আমিও দেখলাম আমার মায়েরে। আকিকা দিয়া নাম রাখা হইলো লামিয়া। আগস্টের শেষ সপ্তায় দেশে আসবো, ছুটি পাইলাম পনেরো দিনের, বিমানের টিকেটও করা শেষ। মেয়ের জন্যে কি কিনবো, মেয়ের মায়েরে কি উপহার দিব সেই চিন্তায় পেরেশান হয়ে আছি, কারো বুদ্ধিই মনে ধরে না।

ঢাকায় তখন ডেঙ্গু ছড়াইতেছে, হাজার হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি। আমি তখনও কিছু জানি না, নিজের চিন্তায় ব্যস্ত। একদিন ফোনে বউ বললো, মেয়েটার নাকি জ্বর দুইদিন ধরে। ডেঙ্গুর কথা মাথায়ও আনি নাই, এই সর্বনাশা ঘাতক যে ঢাকা থেকে এতদূরে গিয়া হাজির হবে, কে জানতো? বউরে বললাম, ডাক্তার দেখাইতে। আরও একদিন গেল, শুনলাম জ্বর নামছে, কিন্ত বাচ্চার খাওয়াদাওয়া বন্ধ, শরীর খুব দুর্বল, কান্নাকাটিও করে না।

একদিন পরে শুনি, আমার মেয়েটার নাকি ডেঙ্গু হইছে, তারে ভর্তি করা হইছে হাসপাতালে! আমার মাথার উপরে যেন গোটা আসমান ভাইঙ্গা পড়লো, দুনিয়াটা ছোট হইয়া আসলো এক মূহুর্তে! দেড়মাসের বাচ্চাটা যখন হাসপাতালে যুদ্ধ করতেসে ডেঙ্গুর সাথে, আমি তখন কাতারে যুদ্ধ করতেসি প্লেনের টিকেট আগায়ে আনার জন্যে। অফিসে জানাইলাম, ছুটি না আগাইলে আমি চাকরি ছাইড়া দিব। মেয়ের চাইতে দামী কিছু আমার কাছে নাই। তারা রাজী হইলো।

তিনদিন পরের টিকেটও ম্যানেজ করে ফেললাম। আর তিন-চারটা দিন পরেই আমি আমার মেয়েটারে কোলে নিতে পারবো! ফোনে খবর পাই, মেয়ের অবস্থা নাকি ভালো না, তারে আইসিইউতে রাখা হইছে। আমার কাছে প্রতিটা মিনিটরে তখন একেকটা দিনের সমান লম্বা মনে হয়! যেদিন প্লেনে উঠবো, তার আগেরদিন ফোনটা আসলো। মেয়েটা আমার মারা গেছে, ডেঙ্গুর সাথে যুদ্ধ করে কুলায়ে উঠতে পারে নাই মা আমার। ফোনে আমি শুধু বললাম, আমার বউটারে একটু দেখে রাইখেন, আমি আসতেছি।

দুইদিন পরে আমি বাড়ির উঠানে পা রাখলাম, ঘর থেকে শুধু আগরবাতির গন্ধ নাকে আসে। এই বাড়িতে একটা ফুটফুটে ফেরেশতা জন্ম নিছিলো, আমার বাচ্চা, আমার সন্তান। সেই সন্তানরে আমি একটাবারের জন্যে কোলে নিতে পারি নাই, একটু আদর করতে পারি নাই। আমার মেয়েটা দেড়মাস পৃথিবীতে থাকলো, হাসলো, কান্না করলো, রোগে ভুগে দুনিয়া ছেড়ে চইলাও গেল, অথচ একটাবার সে তার বাবার স্পর্শ পাইলো না!

বাপ হইয়া আমি নিজেরে কেমনে ক্ষমা করি বলেন? কাতারে থাকি শুনলে অনেকেই ভাবেন টাকার বিছানায় ঘুমাই বুঝি। আমরা প্রবাসীরা আসলে কষ্টের সাগরে ভাসতে থাকি। কাজের কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট, এগুলা তো গায়ে লাগে না। কষ্ট লাগে আপনজনের কাছ থেকে দূরে থাকতে, প্রিয় মানুষগুলার কাছ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকার যে কি যন্ত্রণা, সেইটা সবাই বুঝবে না। নিজের সন্তানরে একটাবারও না দেখে তার কবর জেয়ারত করার যে কি কষ্ট, সেইটা কাউরে বলে বুঝানো যাবে না…!

copy সতর্কতার জন্য দিলাম আমারা যেন আমাদের বাচ্চাদের মশা থেকে নিরাপদে রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *