Sun. Dec 5th, 2021

 

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গত ১৪ নভেম্বর শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হয়েছেন। সম্প্রতি জানা গেছে তিনি লিভার জটিলতার ক্ষেত্রে অন্যতম মারাত্মক রোগ লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। বিএনপির নেতারা বলছেন, এদেশে তার চিকিৎসা সম্ভব না।

তাকে চিকিৎসার জন্য অতি সত্ত্বর বিদেশে পাঠানো দরকার। অন্যদিকে সরকার তার অবস্থানে অনড়। আইনের বাইরে যেয়ে বেগম জিয়াকে দেশের বাইরে যাবার অনুমতি দিতে অপারগ সরকার। এ নিয়ে দুই পক্ষের চলছে কথার লড়াই। এমনকি বেগম জিয়াকে দেশের বাইরে যেতে না দিলে রাজপথে আন্দোলনের ঘোষনাও দিয়ে রেখেছে বিএনপি।

দুই পক্ষের বাদানুবাদে জনগণ কৌতুহলী খালেদা জিয়ার আক্রান্ত হওয়া রোগ ’লিভার সিরোসিস’ নিয়ে। আসলেই কি জটিল কিংবা মারাত্মক কোনো রোগ এটি? কতটাই বা নিরাময়যোগ্য এই লিভার সিরোসিস? লিভার সিরোসিস একটি মারাত্মক ও অনিরাময়যোগ্য রোগ। লিভারের নানারকম রোগের মধ্যে এটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ের একটি রোগ বলে গণ্য করা হয়।

এই রোগে আক্রান্ত হলে যকৃতের ট্রান্সপ্লান্ট বা প্রতিস্থাপন ছাড়া পুরোপুরি আরোগ্য হয় না। যখন লিভারের রোগের নানা পর্যায়ের পর কোষগুলো এমনভাবে আক্রান্ত হয় যে, লিভার আর কাজ করতে পারে না, সেই পর্যায়কে লিভার সিরোসিস বলা হয়। যখন এই রোগে আক্রান্ত হয়, তখন লিভার বা যকৃৎ তার স্বাভাবিক কাজগুলো, যেমন বিপাক ক্রিয়া, রক্ত জমাট বাঁধার উপকরণ তৈরি, ওষুধ ও রাসায়নিকের শোষণ, খাদ্যের পুষ্টি উপাদানের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি করতে পারে না।

লিভার সিরোসিস হলে লিভার বা যকৃতে সূক্ষ্ম সুতার জালের মতো ফাইব্রোসিসের বিস্তার ঘটে। যকৃতে তখন ছোট ছোট দানা বাঁধে। আস্তে আস্তে সেটির বিস্তার ঘটতে থাকে। ফাইব্রোসিস ছড়িয়ে পড়লে সেখানে আর লিভার নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে পারে না, ফলে লিভার সংকুচিত হয়ে পড়ে। প্রশ্ন হলো, সিরোসিস কি নিরাময় সম্ভব? সাধারণত এর উত্তর হচ্ছে ’না’। সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়া মানে লিভার রোগের সর্বশেষ পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া এবং লিভার স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া।

অনেক ধরনের লিভারের রোগ ও জটিলতা আছে, যার মধ্যে শীর্ষে আছে সিরোসিস। লিভারের রোগ বা জটিলতা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পরলে ও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব। যদি লিভারের কার্যক্রম ধীরে ধীরে অবনতি হতে থাকে, তবে সাধারণত সিরোসিসের স্বীকৃত আরো অনেকগুলো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণগুলো হলো-

সহজেই আঘাত পাওয়া ও রক্তক্ষরণ হওয়া, চামড়া হলদেটে রং ধারণ করা এবং চোখ ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া, শরীর চুলকানো, পা এবং গোড়ালিতে ফোলাভাব, পেট/পেটে তরল জমা হওয়া, প্রস্রাব বাদামী বা কমলা রঙ ধারণ করা, হালকা রঙের মলত্যাগ, বিভ্রান্ত হওয়া, চিন্তা করতে অসুবিধা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, মলে রক্ত আসা, হাতের তালুতে লালভাব, শিরা-উপশিরার চারপাশে ত্বকে ছোট ছোট লাল দাগ দেখা দেওয়া ইত্যাদি। এছাড়াও পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌন ক্ষমতা হ্রাস, বর্ধিত স্তন, অণ্ডকোষ সঙ্কুচিত হওয়া এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে অকাল রজোবন্ধ, অর্থাৎ আর মাসিক না হওয়ার মতো লক্ষণগুলো দেখা যায়। তবে লিভারে সিরোসিস নির্ণয় হওয়া মানেই এই নয় যে, অবস্থা এরই মধ্যে মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। তবে সিরোসিস চলতে থাকলে অবস্থা যেকোন সময় মারাত্মক প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে এবং লিভারের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকবে।

এমনকি আক্রান্ত লিভার তার জীবনের জন্য হুঁমকি হয়ে উঠতে পারে। যদিও তখনও আশা থাকবে। শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা হিসেবে লিভারের দুর্বল কার্যকারিতার কারণে রক্তে যাতে বিষাক্ত পদার্থের গঠিত না হয় সেজন্য ওষুধ দেওয়া হতে পারে। চিকিৎসার এই পর্যায়কে হেপাটিক এনসিফেলোপ্যাথি বলা হয়ে থাকে। তবে সিরোসিস যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় যখন লিভার কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তখন লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টই একমাত্র বিকল্প চিকিৎসা হতে পারে। লিভার প্রতিস্থাপন হলো মৃত দাতার সুস্থ লিভার বা জীবিত দাতার লিভারের অংশকে আপনার অসুস্থ লিভারের জায়গায় প্রতিস্থাপন করা।

সিরোসিসের কারণেই পৃথিবীব্যাপী সবচেয়ে বেশী লিভার প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে লিভার প্রতিস্থাপন করা হলেও লিভার সিরোসিস সারা জীবন বহন করতে হয়, পুরোপুরি আরোগ্য লাভ হয় না। তবে সঠিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জটিলতা দূর করা যেতে পারে। অনেকগুলো কারণে লিভার সিরোসিস বা লিভারের রোগ হয়ে থাকে। সতর্ক হলে অনেকাংশে এগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, শারীরিক পরিশ্রম করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে আনা, কোলোস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা, স্থূলতা দূর করা ইত্যাদির মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। দূষিত পানি, অতিরিক্ত মদ্যপান, খোলা ফলমূলের মতো যেসব কারণে যকৃতের রোগ হয়, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *