Sat. May 28th, 2022

 

সারাদেশে বিভিন্ন ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন চলছে। আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের দ্বন্ধে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়ছে প্রাণহানি, সেখানে অনেক জায়গায় যুক্ত হচ্ছে স্বতন্ত্র রুপে লুকিয়ে থাকা নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপি।

জামায়াতও পেছন থেকে সহিংসতায় ইন্ধন দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এর ফলে উৎসবের নয়, বরং বিচ্ছেদে রুপ নিচ্ছে ইউপি নির্বাচনগুলো। স্বজন হারানো বাড়িতে কান্না ও প্রাণফাটা আহাজারি মানুষের মনে সৃষ্টি করেছে নিদারুণ কষ্ট।

তৃণমূল যেন এক মৃত্যু উপত্যকা। এ বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় কমপক্ষে ৮৬ জনের প্রাণহাণির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আর গত এক মাসের নির্বাচনি সহিংসতায় ৪৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফোরাম (এমএসএফ)।

আসক সূত্রে জানা যায়, নিহতদের বেশিরভাগই তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী। সারাদেশে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিসহ দেশ ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি যখন সংকট তৈরিতে মুখিয়ে আছে, তখন কোন্দল-কাঁটায় বিদ্ধ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তৃণমূলে একের পর এক ঝরছে তাজা প্রাণ।

আসক এর তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৬৮৮টি নির্বাচনি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন আট হাজার ৫৯৪ জন এবং নিহত হয়েছেন ১২৯ জন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগেরই ৫৭ জন। শুধুমাত্র ইউপি নির্বাচনেই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪৪২টি।

এসব সহিংসতায় আহত হয়েছেন পাঁচ হাজার ২৩৪ জন এবং নিহত হয়েছেন ৮৬ জন। আসক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জেলার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নিহতদের অধিকাংশই আওয়ামী ঘরানার।

তৃতীয় ধাপের সহিংসতা সর্বশেষ গত ২৮ নভেম্বর ছিল তৃতীয় ধাপের নির্বাচন। ভোট হয়েছে ৯৮৬ ইউপিতে। গত ২৫ থেকে ২৮ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভোলা ও টাঙ্গাইল জেলায় আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্বে অন্তত তিনজন নিহত হন। ভোটের দিন টাঙ্গাইল, লক্ষ্মীপুর, নরসিংদী, খুলনা, যশোর, ঠাকুরগাঁও ও মুন্সীগঞ্জে সংঘাতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। তৃতীয় ধাপের এ নির্বাচন চলাকালে এবং এর আগে ও পরের সংঘাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ ঝরেছে কমপক্ষে ১৫ জনের, আহত হয়েছেন শতাধিক। ভোটের দিন সংঘর্ষে মৃত্যু হয় আটজনের।

ভোলা: গত ২৬ নভেম্বর ভোলা জেলার সদর উপজেলায় নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে মো. খোরশেদ আলম টিটু (৩২) নামে এক যুবলীগ নেতার মৃত্যু হয়েছে। নিহত খোরশেদ উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কানাইনগর গ্রামের তছির আহম্মেদের ছেলে ও ওই ইউনিয়নের যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

পিরোজপুর: ১৬ই নভেম্বর নির্বাচনী সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে পিরোজপুরের যুবলীগের নেতা ফয়সাল মাহবুবের। ৭ই নভেম্বর পিরোজপুরের শংকরপাশা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থায় তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন হাসপাতালে। ফয়সাল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন।

লক্ষ্মীপুর: জেলার রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সজিব হোসেন নিহত হয়েছেন। ভোটকেন্দ্র এলাকায় সহিংসতায় প্রথমে আহত ও পরে ঢাকায় নেওয়ার পথে চাঁদপুরে অ্যাম্বুলেন্সে মারা যান তিনি। নিহত ছাত্রলীগ নেতা সজিব হোসেন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী শাহেনাজ আক্তারের সমর্থক ছিলেন।

টাঙ্গাইল: তৃতীয় ধাপের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ২৬ নভেম্বর আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় তোতা শেখ (৪০) নামে এক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির ছেলের মৃত্যু হয়। নিহত তোতা শেখ উপজেলার দপ্তিয়র ইউনিয়নের রেহাই পাইকাইল গ্রামের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্কেল মেম্বারের ছেলে বলে জানা গেছে।

শরীয়তপুর: ২৬ নভেম্বর নির্বাচনের আগেই শরীয়তপুর সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের (নৌকা) চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক আব্দুর রাজ্জাক মোল্লাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা।

খুলনা: তৃতীয় ধাপের সহিংসতায় খুলনার তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নে বাবুল শিকদার (৩৮) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মহসিনের সমর্থক ছিলেন। ভোটের প্রচার চালানোর সময় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা তাকে হাতুড়িপেটা ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকায় নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

কক্সবাজার: জেলার চকরিয়ার বদরখালী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের নতুন চেয়ারম্যান নুরে হোছাইন আরিফের ভাগনে গিয়াস উদ্দিন মিন্টুকে (৫০) পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে ফল ঘোষণার পর। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আরিফ জয়ী হন। ফল ঘোষণার পর বিজয় মিছিলে চশমা প্রতীকের বিদ্রোহী প্রার্থী হেফাজ সিকদারের লোকজনের হামলায় মারা যান তিনি।

যশোর: ভোটের আগের রাতে ২৭ নভেম্বর যশোরের শার্শার কয়রা ইউনিয়নে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে কুতুব উদ্দিন (৩০) নামে একজন নিহত হন। নিহত কুতুব উদ্দিন রুদ্রপুর গ্রামের মহিউদ্দিনের ছেলে ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী চেয়ারম্যান প্রার্থী আলতাফ হোসেনের সমর্থক।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া: জেলার নবীনগরে নির্বাচনী বিরোধকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের সংঘর্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফা মারুফের সমর্থক মাসুদ মিয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত মাসুদের বাড়ি উপজেলার রতনপুর ইউনিয়নে খাগাতুয়া গ্রামে।

নরসিংদী: গত ২৪ নভেম্বর নরসিংদীর রায়পুরার চান্দেরকান্দি ইউনিয়নে ব্যালটবাক্স ছিনতাই চেষ্টাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে আরিফ মিয়া (২৪) ও শরিফ নামে দু’জন নিহত হন। চান্দেরকান্দি ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন খোরশেদ আলম। আনারস প্রতীকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন মেছবাহ উদ্দিন খন্দকার মিতুল। এ দুপক্ষের সংঘর্ষে এদের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। একই উপজেলার উত্তর বাখরনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ফরিদ মিয়া (৩২) নামে একজন নিহত হন। এরা সকলেই আওয়ামী লীগের সমর্থক বলে জানা গেছে।

কুড়িগ্রাম: গত ২৪ নভেম্বর কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ভাঙামোড় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দুই সদস্য প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতায় বাবুল মিয়া (৪০) নামে একজন নিহত হয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জ: মুন্সীগঞ্জে সদর উপজেলায় ইউপি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পৃথক সহিংসতায় রিয়াজুল শেখ (৭০) ওশাকিল (১৭) নামের দু’জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। রিয়াজুল মুক্তারপুর গোসাইবাগ এলাকার বাসিন্দা। নিহতের ভাই মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের টেলিফোন প্রতীকে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নিহত শাকিল শরীয়তপুরের মোহাম্মদ হারুন মোল্লার ছেলে। শাকিল ওই ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য রাবেয়া বেগমের ভাগনে ছিলেন।

কিশোরগঞ্জ: গত ২৮ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ এনামুল হক ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে দেলোয়ার হোসেন (৩৮) নামে একজন মারা যান। দেলোয়ার বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলামের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।

এছাড়া সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় নির্বাচনী সহিংসতায় আহত স্কুলছাত্র দেলোয়ার হোসেন সাগর (১৬) নামে একজন মারা গেছেন। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে চারজন নিহত হয়েছেন। নিহত চারজন হলেন- ঘিডোব গ্রামের অবিনাশ রায়ের ছেলে এইচএসসি পরীক্ষার্থী আদিত্য কুমার রায় (২৩), আবদুল বারীর স্ত্রী রহিমা বেগম (৬৪), হাবিবপুর গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মো. সাহাবুলি (৩৬) ও ছিট ঘিডোব গ্রামের মৃত তমিজ উদ্দিনের ছেলে মোজাহারুল ইসলাম (৩৭)।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.