Wed. Jan 26th, 2022

 

গত কিছুদিন ধরেই সদ্য মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। এমনকি তার সিনিয়র মন্ত্রী তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ আজ সাংবাদিকদের বলেছেন যে, গত তিন মাস ধরেই মুরাদের আচরণ অস্বাভাবিক ছিল।

কখনো তিনি নায়িকা মৌসুমীকে স্লিম হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, কখনো শাকিব খানকে অভিনয় আরও রপ্ত করতে বলেছেন, কখনো তিনি ঢাকা ক্লাবে গিয়ে অশালীন, আপত্তিকর, কুৎসিত নোংরা ভাষায় চিৎকার-চেঁচামেচি করেছেন, কখনো মঞ্চে উঠে গান গেয়েছেন।

এই সবকিছু মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি হয়েছিল যে, মুরাদ যেন আওয়ামী লীগের এক মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি যেন নিয়ন্ত্রনহীন, অসংযত এবং অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার ছিলো যে, মুরাদ এসব বক্তব্যকে জায়েজ করতেন এই বলে যে, তিনি যেসব কথাবার্তা বলছেন সেই সমস্ত কথাবার্তা প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়েই বলছেন।

ফলে পুরো বিষয়টিতে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে ফেলার ফলে একটি বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে কেন এত বেপরোয়া হয়েছিলেন মুরাদ হাসান? একাধিক ব্যক্তিরা বলছেন যে, না চাইতেই অনেক বেশি পাওয়ার কারণেই মুরাদ বেপরোয়া হয়েছিলেন। আবার অনেকে মনে করেন যে, আলোচিত হবার জন্য ডা. মুরাদ এরকম আচরণ করেছিলেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, হতাশা থেকেই মুরাদ হাসান এরকম করেছিলেন।

২০০৮ সালে মুরাদ এমপি নির্বাচিত হলেও ২০১৪ সালে তিনি মনোনয়ন পান নাই। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তাকে আবার মনোনয়ন দেওয়া হয়। ডা. মুরাদের বাবা আওয়ামী লীগের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা ছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। সে কারণেই আওয়ামী লীগ সভাপতির বিশেষ স্নেহধন্য হয়েছিলেন মুরাদ হাসান। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তাকে প্রথমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ওই মন্ত্রণালয়ে তিনি বেশিদিন থাকতে পারেননি।

মন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে। তথ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তিনি বেশ কিছুদিন চুপচাপ ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করেই তিনি আলোচনায় আসেন। ডা. মুরাদ প্রথম আলোচনায় আসেন রাষ্ট্রধর্ম বিতর্ক নিয়ে। তিনি বলেন যে, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল হওয়া উচিত এবং এই রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা সম্ভব।

এই বক্তব্যটি বিভিন্ন মহল সমালোচনা করলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনাকে ধারণ করা বহু মানুষ এই বক্তব্যটিকে সাদরে গ্রহণ করেছিল এবং এসময় তিনি বিভিন্ন মহল কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছিলেন। তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে যখন পরিকল্পনা মন্ত্রী আব্দুল মান্নান একই রকম বক্তব্য দিয়েছিলেন তখন এটি স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষকে আশান্বিত করেছিলেন। বহু মানুষ মুরাদ হাসানের প্রশংসা করেছেন।

সেখান থেকেই কি মুরাদ হাসান বিপথে পরিচালিত হলেন? এই প্রশ্ন অনেকে করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ড. হাছান মাহমুদের মত হেভিওয়েট মন্ত্রীর আড়ালে থাকা মুরাদ একটু লাইমলাইটে আসতে চেয়েছিলেন। আর লাইমলাইটে আসার জন্যই তিনি লাগামহীন নানা রকম কথাবার্তা বলা শুরু করেন। তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এরকম বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তারা মনে করেন যে, লাইমলাইটে আসার জন্য মন্ত্রীকে এ ধরনের কথা বলতে হবে কেন?

বরং তাদের ধারণা যে, ডা. মুরাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল যে, মন্ত্রী হিসেবে তার কোন কাজ নাই। এ কারণেই হতাশা থেকে হয়তো তিনি এ ধরনের বক্তব্য রেখেছিলেন। গত কিছুদিন ধরে তার বিভিন্ন কুঅভ্যাস প্রবল হয়ে উঠেছিল বলেও তার ঘনিষ্ঠরা জানান। এসব মিলিয়ে তিনি অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়েছিলেন কিনা সেই প্রশ্ন কেউ কেউ করেছে। তবে যাই হোক না কেন ডা. মুরাদের এই বেপরোয়া হয়ে যাওয়াটি সকলের কাছেই বিস্ময়কর। তিনি কি কারো এজেন্ট হিসেবে এটি করেছেন কিনা সে প্রশ্নও কেউ কেউ করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.