Wed. Jan 26th, 2022

 

পুকুর ডোবা খাল-বিলে অবহেলা, অনাদরে আর অযত্নে পড়ে থাকা দেশীয় ছোট ছোট শামুক এখন আর ফেলনা নয়। দেশি জাতের শামুক চাষও খুলে দিতে পারে বানিজ্যিক সম্ভাবনার দুয়ার। শামুকের মাংস থেকে মাছের খাবার আর শামুক খোসা থেকে চুন। তা আবার মাছ চাষেই ব্যবহার করা হয়।

তাছাড়া শামুকের মাংসে রয়েছে নানা পুষ্টিগুণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। শামুকের মাংস মানুষের খাবার হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয় দেশ-বিদেশে। আমাদের এখানেও এর প্রসার যে সম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গ্রামে গঞ্জে অজস্র ছোট-বড় পরিত্যক্ত্ পুকুর ডোবায় দেখা মেলে শামুকের। শামুক চাষের মধ্য দিয়েও সৃষ্টি হতে পারে বহু কর্মসংস্থান, আসতে পারে জল-কৃষিতে সাফল্য।

জলাশয়গুলোয় মাছ ও চিংড়ি ছাড়াও আরও অনেক বৈচিত্র্যপূর্ণ জলজ সম্পদ রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হল শামুক। অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় অপ্রচলিত এসব জলজ প্রাণীর বাণিজ্যিক চাষের উদ্যোগ নিলে লাভবান হওয়ার সম্ভব। বিদেশে শামুকের বানিজ্যিক চাষের প্রসারও ঘটছে। গ্রিসে আপেল শামুকের চাষ করে সাবলম্বি হচ্ছেন ওখানকার অনেক বেকার যুবক-যুবতী।

গ্রিসের মারিয়া ভ্লাচু মহিলা শামুক চাষি। ক্রিসটোস মাউসকোস পুরুষ চাষি। উৎপাদনের ৭০% রফতানি করেন। তাই এটা প্রমানিত যে, সঠিক পদ্ধতিতে শামুক উৎপাদনে জীবন-জীবিকার উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। শামুকের বানিজ্যিক গুরুত্ব কি? শামুকের খোলস থেকে চুন তৈরি এবং এর মাংসল অংশ মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়।

আর শামুক খোসা বা খোলস থেকে তৈরি চুন আবার মাছ চাষেই ব্যবহার করা হয়। আবার শামুকের মাংস মানুষের খাদ্য হিসেবেও বাজারে বিক্রি হয়। আমরা খাদ্য হিসেবে শামুক গ্রহণে অভ্যস্ত না থাকলেও অপ্রচলিত এই জলজ প্রাণিটি কিছু কিছু মানুষের কাছে খুব সুস্বাদু খাবার হিসেবেই বিবেচিত। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শামুকের মাংস খাদ্য হিসেবে প্রচলিত।

আজকাল শামুকের মাংস বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের পাতে এক উপাদেয় খাদ্য হিসেবে বিবেচিত। এমনকী, কিছু বড় রেস্তোরাঁতেও শামুকের পদ পাওয়া যায়। শামুকের মাংসে রয়েছে নানা পুষ্টিগুণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তাই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মানুষের মধ্যেও শামুক মাংস খাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। মাছ চাষে শামুকের ব্যবহার সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব।

অনেকক্ষেত্রেই মাছ চাষের পাশাপাশি শামুক চাষে আলাদা খাবার দেওয়ার দরকার হয় না। শামুক পুকুরে বায়োফিল্টার হিসেবে কাজ করে। ফলে জলের গুণাগুণ ভালো থাকে। শামুকের শরীরে রয়েছে প্রাকৃতিক জলশোধন ব্যবস্থা (ফিল্টার)। এরা ময়লাযুক্ত জল পান করে। যে জলটা বাইরে ছাড়ে তা বিশুদ্ধ। অন্যদিকে মাছ চাষে শামুকের ব্যাপক ব্যবহার যেমন সাশ্রয়ী তেমনি পরিবেশবান্ধব। শামুক থেকে উৎপাদিত খাদ্য মাছ বেশি খায়। কারণ, এ খাবার অনেকটাই প্রাকৃতিক।

এতে মাছ তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধিও পায় বেশি। এ ছাড়া শামুকের তৈরি খাবার খাওয়া মাছ স্বাদেও অনেকটা ভালো হয়। এ ছাড়া হাঁস কে নিয়মিত শামুক খাওয়ালে হাঁসের মাংস ও ডিমের উৎপাদন বাড়ে। এ কারণে মাছ ও হাঁস চাষ হয় অনেক লাভজনক। শামুকের তৈরি খাদ্য পাঙ্গাশ, চিংড়ি, শিং, মাগুর, কৈ ও তেলাপিয়া মাছের ভীষণ প্রিয়। আর অন্যন্য মাছ ও চিংড়ির চাষে মাছের খাদ্য উপাদানের অন্যতম উপকরণ প্রোটিন। শামুকের মাংসে ৩২% প্রোটিন থাকে।

যা এই শামুকের মাংস থেকে পাওয়া যায়। শামুকে কোনও ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে না। আবার শামুক থেকে খাদ্য তৈরি করলে মাছের খাবার বাবদ ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। শামুক চাষ অত্যন্ত সহজ পদ্ধতি। শামুকের প্রজনন ক্ষমতা বেশি হওয়ায় বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা যায়। প্রতি ডেসিম্যাল পুকুরে এক কেজি গোবর, এক কেজি খোল (সরষে) ও ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া জলে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এ মিশ্রণ সমান চার ভাগে ভাগ করে তিন দিন অন্তর জলে ছিটিয়ে দিতে হবে। পুকুরের জলের রং যখন গাঢ় সবুজ হবে, তখন বুঝতে হবে পুকুরটি শামুক চাষের উপযোগী হয়েছে।

এরপর খালবিল বা পুকুর থেকে শামুক সংগ্রহ করে প্রতি ডেসিম্যাল হিসেবে ২৫০ গ্রাম শামুক পুকুরের চারদিকে ছিটিয়ে দিতে হবে। পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শামুক ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করবে। এরপর ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শামুক পাওয়া যাবে। চাষ পদ্ধতি শুরুর ৪০-৪৫ দিন পর শামুক সংগ্ৰহ করতে হবে। এজন্য বাঁশ বা কাঠের বড় লাঠি পুকুরে দিয়ে রাখতে হবে শামুক গুলো ঐ বাশের সাথে আটকে থাকবে। এবার বাঁশ গুলোকে তুলে এনে শামুক গুলো ছাড়াতে হবে। এই শামুককে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহারের জন্য শামুক গুলো ভেঙে রোদে শুকিয়ে পরবর্তীতে মেশিনের সাহায্যে গুঁড়ো করতে হবে।

এবার অন্যান্য খাবারের উপাদানের সঙ্গে মেশানোর পর পিলেট মেশিন দিয়ে মাছের খাবার তৈরি করতে হবে। বাজার সৃষ্টি করতে পারলে বাণিজ্যিকভাবে শামুক চাষ করে প্রচুর টাকা আয় করা সম্ভব। শামুক চাষে কম পুঁজি লাগে বলে সহজেই করা সম্ভব। পুকুর থেকে হেক্টরপ্রতি বছরে চারটি ধাপে চার থেকে ছয় মেট্রিক টন শামুক উৎপাদন করা সম্ভব। শামুককে উনুনে পুড়িয়ে চুন তৈরি হয়। উনুনটি ছোট্ট কুয়োর মতো আকারের করতে হবে। উনুনের নিচে ইট বিছিয়ে দিতে হবে।

ইটের ওপর সাজানো হয় ভাঙা টালির অংশ। এর ওপর ছোট ছোট কাটা জ্বালানী কাঠের টুকরো বিছিয়ে তাতে কেরোসিন তেল ঢালা হয় আগুন ধরানোর জন্য। এরপর আগুন ধরিয়ে ধুঁয়া ওঠা উনুনে ঢালা হয় শামুকের খোসা। এই শামুকের খোসার ওপর আবার দেওয়া হয় জ্বালানী কাঠের টুকরো। এবং তার ওপরে আবারও শামুক। অর্থাৎ জ্বালানী কাঠের টুকরো আর শামুক স্তরে স্তরে সাজাতে হবে। শামুকের খোসা হল চুন তৈরির প্রাচীন কাঁচামাল। এই সব খোসায় আছে চুনের মূল উপাদান ক্যালসিয়াম কার্বনেট। জ্বালানী কাঠ ও শামুকের খোসায় উনুন ভরে উঠলে উনুনের নিচের গর্ত দিয়ে বাতাস করতে হবে।

বাতাস পেয়ে জ্বালানী কাঠের স্তরে স্তরে পুড়তে থাকে শামুকের খোসা। আগুনের তাপে শামুকের খোসার ক্যালসিয়াম কার্বনেট ভেঙে তৈরি হয় ক্যালসিয়াম অক্সাইড। এই ক্যালসিয়াম অক্সাইড সাধারণত চুন বা কুইক লাইম নামে পরিচিত। পুড়ে যাওয়া শামুকের খোসার কুঁড়া চালুনি দিয়ে চেলে এরপর একটি গর্তে ঢালতে হবে। আর এতে পরিমান মতো জল মেশালে তৈরি হয় ক্যালসিয়াম হাইড্রোক্সাইড নামের চুন। এটি খাওয়ার উপযোগী ধপধপে সাদা চুন।

এই ভাবে শামুক দিয়ে পান খাওয়ার উপযোগি চুন ও তৈরি করা যায়। সুতরাং পরিকল্পিত ভাবে শামুক চাষ করতে পারলে খুবই লাভবান হওয়া যাবে। ছোট দেশীয় শামুক চাষ সম্প্রসারণ ও সঠিক বাজারজাতকরণের মধ্য দিয়ে এই জলজ সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তথ্যসূত্রঃUNFOLD BANGLA

Leave a Reply

Your email address will not be published.