Sat. May 28th, 2022

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খুবই পরিচিত একটি পদদ্বৈত ‘তৃতীয় শক্তি’। দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ‘তৃতীয় শক্তি’ কথাটি। অনেকদিন থেকেই তৃণমূল থেকে শুরু করে সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক মহলসহ নানা জায়গায় ‘রাজনীতিতে এবার তৃতীয় ধারার উত্থান জরুরি’ কথাটি উচ্চারিত হয়।

দেশে তৃতীয় বা বিকল্প ধারা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের এবং দিনে দিনে এর প্রাসঙ্গিকতা অধিক অনিবার্য হয়ে উঠছে বলেও অনেকে মনে করেন। কিন্তু বাংলাদেশের নানা রাজনৈতিক সমীকরণ ও বাস্তবতায় বারবার মার খেয়েছে বা ব্যর্থ হয়েছে সেই অনিবার্যতা।

সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়ার নতুন দল গণঅধিকার পরিষদের মাঝে ‘তৃতীয় শক্তি’র টিমটিমে আলো দেখতে পাচ্ছেন। তবে অনেকে এর উল্টোটাও বলছেন। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিপি নুর ও রেজা কিবরিয়ার গণঅধিকার পরিষদকে নিয়ে ধুম্রজালের শেষ হচ্ছে না।

অপরদিকে দলটিকে এখনই তৃতীয় শক্তি হিসেবে মনে না করলেও এই দলটির তৃতীয় শক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ভিপি নূরের রাজনীতি নিয়ে সাধারণ ও তৃণমূলের মানুষের মধ্যে তেমন আগ্রহ না থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং তরুণদের মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে।

বলতে গেলে বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের মুখে বেশ জোরেশোরেই উচ্চারিত হয় ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরুল হক নুরের নাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে ছাত্রলীগের রাজনীতি করলেও কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকেই পরিচিতি পান তিনি। সেই থেকে শুরু হয় তার রাজনৈতিক সংগ্রাম। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সভাপতি নির্বাচিত হন। এভাবে ধীরে ধীরে মূল রাজনীতিতে নাম লেখান ভিপি নুর। এখন বাঘা বাঘা রাজনৈতিক দলকে হুংকার দিয়ে কথা বলছেন।

অন্যদিকে রেজা কিবরিয়া রেজা কিবরিয়া একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবীদ এবং আওয়ামী লীগের সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে। মাঠের রাজনীতির অভিজ্ঞতা না থাকলেও কূটনৈতিক পাড়ার অনেকেই সাথেই তার যোগাযোগ আছে। এছাড়া তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তিও বটে। ভিপি নুর ও রেজা কিবরিয়া, দুজনই তরুণদের টার্গেট করে এই নতুন রাজনৈতিক দলটি এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।

বিশেষ করে ‘কোটাবিরোধী আন্দোলন’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের’ মাধ্যমে নূরের ‘ছাত্র অধিকার ফোরাম’ একটি অবস্থান তৈরি করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। সেই অবস্থানকেই কাজে লাগিয়ে মূলত রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হচ্ছেন নূর। ফলে রাজনৈতিকভাবে সচেতন অনেকেই মনে করছেন যে, হয়তো বা ভিপি নূরই দেশে তৃতীয় ধারার রাজনীতি মূলধারায় আনতে পারবে। নুর ইতোমধ্যে কোটা বিরোধী আন্দোলন করে সফলতা পেয়েছে।

তারা যদিও বলার চেষ্টা করে এটা কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল। তবে তত্বগত ভাবেই এটি কোটা বিরোধী বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী আন্দোলন ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকতেই এরা এ ধরণের দাবি তুলে আদায় করতেও সমর্থ হয়েছিল! সেসময় তরুণদেরকে উসকে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা এক প্রকারের অচলই করে ফেলেছিলেন নুর। ফলে নুরকে নিয়ে এখনও অনেক অমিমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে। এর ফলে স্বভাবতই তার দলকে নিয়ে রাজনৈতিক মহল ছাড়াও সাধারণ মানুষের মনে হরেক রকমের প্রশ্ন জন্মাচ্ছে।

বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দলটি অবস্থান কেমন হবে ছাড়াও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে আঁতাত করবে কিনা, এ ধরণের শঙ্কাও করা হচ্ছে। তবে দলটি নিয়ে আশাবাদীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। আর এ আশাবাদী গোষ্ঠীই ভিপি নুরের নতুন দলকে ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে রাজনীতি চাইছেন। তবে দলটির কর্মকাণ্ড দেখে তারপর দলটির চরিত্রগত দিকসহ দলটি সম্পর্কে সার্বিকভাবে মূল্যায়ন করতে চাইছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

অন্যদিকে, এ ধরণের কথাবার্তার বিপরীত কথাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে। বিষয়টিকে এত সরলীকরণ করতে চাচ্ছেন না অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, নূরের এই রাজনৈতিক উদ্যোগের পেছনে আওয়ামী লীগ বা সরকারের একটি মৃদু সমর্থন রয়েছে। আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি না আসে তাহলে যে রাজনৈতিক সমীকরণ এবং মেরুকরণ হবে সেই মেরুকরণ মাথায় রেখেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভিপি নূরের গণপরিষদ গঠন করা হতে পারে বলেও সন্দেহ করছেন।

বিশেষ করে বিএনপি ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপে যায়নি। উল্টো যেসব রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সংলাপ বর্জন করেছে, তাদের সাথে বৈঠক করার চিন্তা ভাবনা করছে। ফলে দলটি নির্বাচন বর্জন করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এরকম পরিস্থিতি একটি গ্রহণযোগ্য বিরোধী দল হিসেবে নুরের দল আসলে অনেকেই তাদের সমর্থন জানাবে। তবে নতুন দল প্রসঙ্গে নুর ও রেজা কিবরিয়ার বক্তব্য পরিষ্কার।

তারা গণঅধিকার পরিষদ নিয়ে বলছেন যে, এখানে লুকোচুরির কিছু নেই। তরুণদের নেতৃত্বে তার রাজনৈতিক দল পরিচালিত হবে। যারা নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করতে চায়, পজিটিভ চিন্তা করে নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার জন্য, তাদের সঙ্গে প্রয়োজনে তিনি মিলেমিশে কাজ করবেন। আর যদি সে রকম কাউকে না পান তবে একাই এগিয়ে যাবেন। এমতাবস্থায় তরুণদের নেতৃত্বে ভিপি নুর ও রেজা কিবরিয়ার দল রাজনীতিতে নতুন ধারা তৃতীয় শক্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায় কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.